Saturday, 18 September 2010

যন্ত্রণা

বুকের ভেতর এক ক্ষিপ্র হাওয়া
বয়ে যাই ওকে নিয়ে সারাবেলা
এ কেমন দহন -রূপ নেই, গন্ধ নেই, ছন্দ নেই
কেবল শূন্যতা, বিষাদময়।
চেনামুখ হেসে ওঠে অলিক হাসি
তার মাঝে খুঁজে ফিরি সুপ্তনিবাস
যখন ফুরায় সময়
হিসেব কষে বার বার শূন্য উদ্যান
তবু
নিয়তির কাছে বন্দক রাখিনা
এই মন।
শ্বশ্মান-ভূমিতে আজ সফেদ নৌকা বানাই।

শরীর

অনেক করে ফেরে না যখন
কেউ কেউ ফেরে
একই মুখ ফিরে আসে শিহরণে
ভাঙিয়ে দিতে চায় ঘুমের আফিম
ভালোবাসা যতবার দূরে ঠেলে দেই
ততবারই হরণ করে আমার নিয়তি
খেলে তানপুরা
স্বরলিপির সাতনটি সুরে।
এ সুর আমার তনু
এ সুর আমার মরণ।

নীড়

একদা ঠিকানা ছিল
ওমে ওমে ভরা ছিল নীলুওয়া পবন
প্রবল প্রতাপে ছিল স্বপ্ন আমার
পাখিদের ঠোঁটে ঠোঁটে গল্প ছিল
একদিন,
প্রবল অহঙ্কারে নড়ে ওঠে নীড়ের খুঁটি
সেই থেকে বহুদিন পড়ে আছি
নীড়হারা পাখির সুরত।

প্রবলবাসনা

লোকালয় আর ভালো লাগে না
দূরে অন্যখানে
যেখানে কেবল চিত্রের ক্যানভাস জুড়ে
বিছিয়ে রয় সাদা সাদা পাপড়ির ঝাড়
সমুদ্র উত্তাল ঢেউয়ের গতি
কখনও পাহাড়ের নিস্তব্ধতা
জ্যোৎস্নার আলো, হাস্নাহেনা
সুগন্ধী মৌ মৌ আর
সুখময় রাতের শরীর।
প্রবল বাসনায় শুধু রচনা করি তুমি
কেবল তুমিময় দিন
এমন বাসনা যেন প্রতিদিন রয়।

মুখ ও মুখের আদল

মুখের আদল ভেঙে গেলে
চেনাহীন সুখগান ফিরে ফিরে আয়
তার গভীরে বাজে
চাপাচাপা সুর, মাদল মাদল গান
গেয়ে যায়  এ আমার পৃথিবী, এ আমার সুখতান।
এ সুর গোপনে রয়
এ সুর আড়ালে বাজে
এ সুর বাসেনা ভালো
সে কোন নির্দয়?

প্রতিদিন

মানুষ এক বন্ধনহীন গোখরা
তাকে বাঁধে নিয়মের জাল
না হয় সে প্রতিদিন অসুরসম
বিভৎস কঙ্কাল।
ভয় তাকে ধরে রাখে
নিয়ম তাকে শিকল পড়ায়
তবু সে চঞ্চল
একটু ফসকে গেলে
হয়ে ওঠে মৃত্যুময়।
নিত্যদিন মানুষের লাগি মানুষ কাঁদে
নিত্যদিন মানুষের লাগি মানুষ মরে।

সাধন

ভবিতব্যের কথা ভাবি না
ভাবি তুমি;
তুমি এক সর্বনাশা পদ্মার ঢেউ
টালমাটাল।
জখম করো না এই জখমি-হাওয়া
কালঘুমে আজ স্বপ্ন হয়েছে নাশ
তবু সাধনায় স্বপ্ন ফুটে
এই অবিধায় আজও বেঁচে আছি
নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখি।

বাউলমন

দিনের আলো শেষে আগমন সন্ধ্যার
ফেরারী পাখিরা, সব ফিরে আসে
ফিরে না ঘরেই শুধু বাউল এ মন
অন্যখানে অন্যখানে
খোঁজে তার ঠিকানা-আবাস

কবি তুমি এক অনন্ত বন্ধু

কেমন আছ?
এই চিরচেনা প্রশ্নে আজও উতাল হই
বুকের পাঁজর খুলে জিজ্ঞাসা বেরিয়ে আসে
সে কি আমি নই।
নীল দেখে আমি অভ্যস্ত জেনো
নীলের গভীরে আরো যেতে চাই;
তুলে নাও আজ এক-লহমায়
অজান্তে যদি আমি ডুবি
সেই পথে তোমাকে ডুবাই।

শূন্য

অনেক প্রার্থনা শেষে ভয় ধরিয়ে দিলে
আমি গভীর অন্বেষায় ভালোবাসা খুঁজি
তবু ভয় চৌদিক কম্পিত করে।
ধ্যানের ভেতর উঠে এসো
শঙ্কা, চলে যাক গোহায় গোহায়
আমি ব্রতি হবো, অভিমানে এ চোখ গর্ভবতী হলে
তবেই শূন্যে তুলে দেবো ফুলেল আচল।

হংসের রাত

গহীন রাত, শূন্য নগর
আকাশে তারার মিছিল
কী অপূর্ব রজনীর নাজুক শরীর
কাল নক্ষত্র সব মরে গেছে।
সূর্যমুখীর ভাবনা এসে উঁকি দেয়
মনের দ্বারে ম্রিয়মান নক্ষত্র
পাঁজরের কষ্টগুলো শিশু-হাতে পয়সার মতো
হারিয়ে যেতো
পায়রার পালক হাতে কেউ বুলিয়ে দিতো নীলুয়া পরশ
হয়ত আবার তুলে নিতাম সোনার নোলক,
হাতে চুড়ি, কপালে লাল টিপ, চোখে সপ্ন শত শত।
আহা এমন যদি হতো, আজই এই রাতে
সবুজ বৃষ্টি এসে স্মৃতিগুলো তুলে নিতো
আবার হয়ত খোলা ক্যানভাসে
সোনার পাপড়ি দিয়ে সাজাতাম হংসের রাত।

আগুন

পুড়ে যাবো জেনে হাত বাড়াই
স্পর্শের কাঙাল আমি;
উষ্ণ চরে মাথা রেখে
সবুজ ঘাসের কাচা গন্ধ
নিঃশ্বাসের উত্তাপে গলে গলে
হতে চাই শাদা তুষার থেকে
সমুদ্রের নোনা জল।

নিয়মের সাজানো দোকান ভেঙে
পেতে চাই আগ্নেয়গিরির সুপ্ত লাভা

দূর অরণ্যে ছিলে

দুর অরণ্যে ছিলে -
এখন এসেছো নাগর
কাছে এসে কথা বলো
কদাচিৎ।
না হয় দুর থেকে হলুদ নক্ষত্রের মতো
মিটিমিটি হাসো।
হে সবুজ দ্বীপের দূত 
দ্বিধার লাজুকতা ভুলে
একটু ছুঁয়ে দেখো,
কতখানি ব্যাকুলতা লুকানো এই
মাটির বৈয়ামে।

যদি পারো একবার শুধু একবার
ডুব দাও ঐ উতাল গাঙের বুকে,
যেখানের জলজ সামুক হাঁটে
কোনো এক সাগরের টানে।

জানতে ইচ্ছে করে

পচারসের স্বাদ নেইনি কখনও
ঘৃনায় বরাবরই থেকেছি সহস্র মাইল দূরে।
শুনেছি -
পচা রস পাঁজর ভাঙে
অঝরা কস্টগুলো নিরাময় শেষে
উজান কলসির সখ্যতা বাড়ে।
হায় রস,
গিরিপথের লাল আভাকে
কখনও কি নেভানো যায়?

কাঁচারস

এক ঝাঁক মেঘের শাড়ি
সে-যে গগণের তনুতেই বাঁধা
সেই অম্বর সাদা
কপালে সোনালী রোদের হরিণী
টিকলি বড়ই বেমানান।
তারচে ভালো কবিতার কাঁচা রস
পান করা, শব্দের সাথে শব্দের মহুয়া মিলন
ছন্দের সাথে ছন্দের উষ্ণ আলিঙ্গন
এ যেন পিরিতের এক বেয়ারা নেশা।
যে নেশার মাতাল নদীতে নিলুয়া সাম্পান
পরাণ ভরিয়া পাল তুলে
চলে যায় শ্যামের আপন কুঠিরে

জলজ-শামুক

জলে ফোঁটা নীল পদ্মের
ওম স্পর্শ হয়নি কখনো!

নিত্যদিন অসংখ্য শব্দফেরী
অমবশ্যার ঘন অন্ধকার ডুবে
জোৎস্নায় প্লাবিত আকাশ, রঙীন
প্রজাপ্রতির ডানায় বাহারী স্বপ্ন।
তারপর...
প্রবল অহংকারে ছিড়ে যায়
তানপুরার তার
কাঁচা মাটির সোদা গন্ধে বিভোর এক
জলজ-শামুক।

ম্রিয়মান

শব্দের নগরে উড়ে বেড়ায় মিষ্টি-
রোদের বাহারী প্রজাপতি

ধুয়া উঠা গরম চায়ের কাপ
টেবিলে এলোমেলো ফুলেল পাপড়ী
সমুদ্রে টালমাটাল ঢেউ-
উথলা হাওয়া
নীল আকাশ, নক্ষত্রের ফুল।

সময়ের ধুলোবালি অন্ধ গলিতে
নি®প্রাণ বসে থাকে মৌসুমী পাখিরা
যাদের কন্ঠের গান সুরহীন ম্রিয়মান।

বৃষ্টির গীত

দূরের গুহায় সুপ্ত আগ্নেয়গিরির লাল আভা
শঙ্কের সাম্পান ভেসে আসে পায়রার পালক।

তামার প্রাসাদে অন্ধ বালিহাঁস
হাওয়ায় শুনেছিলো বৃষ্টির গীত
হলুদ সরিষার সুখ সুখ গন্ধ।

নেশাভরা চোখ রঙীন কোলাহলের ভিড়ে
খুঁজে নিল কয়েকটি নীল পদ্ম -
যে পদ্মের উষ্ণতায় কুকড়ে আছে মেঘবালিকা।

শবদেহ

বড্ড বেশী দেরী হয়ে গেলো
জীবন সায়াহ্নে কি দেবো ?
পুড়ে গেছে, ক্ষয়ে গেছে সব
যেটুকু বাগান ছিলো -
তাও আজ ধু ধু মরুপ্রান্তর।

ধূসর শবদেহ ঘুমে মগ্ন কাঠালের বনে
চৌদিক ঘিরে আছে মাকড়ের জাল।

দিনান্তের শেষে এক মুঠো রোদ্দুর
আলো দিয়েছিলো তুলসী তলায়
ভেঙে যাওয়া পিতলের বাটি
পারেনি রাখতে হলুদ উষ্ণতা।

করতল

পরিচিত ইট বালির শহরে আজন্ম
শুধুই হেঁটেই চলেছি -

দিনান্তের শেষে কালো বেণীতে পাকানো সন্ধ্যা
দীর্ঘ রজনীর শরীর বেয়ে উঁকি দেয়া ভোরের সূর্য
অবেলায়, অনাদরে ঝরে পরা হলুদ পাতার গোঙানী।

জীবন সায়াহ্নে শূণ্য করতল, টেবিলে শঙ্কের
প্রদীপ ম্রিয়মান। দীর্ঘপথে সঞ্চিত
ভুল মন্ত্রগুলো কেবলই সাথী হয়ে হাটে

ডেফোডিল

অলিক স্বপ্নেও ছিলো না কখনো
হঠ্যাৎ এক বিজলী মায়ার দোকানে
টাঙ্গানো ঢাকাই শাড়ীর মতো
মিমিষেই কেড়ে নিল মন।

সেই থেকে সাতশ ত্রিশটি দিন -
কৃষ্নচুড়ার মতো দাঁড়িয়ে
সুখ থেকে বিরহ, বিরহ থেকে সুখ
দুচোখে ভর্তি সোনালী স্বপ্নরা এখনো সরব।

মাথার খোলা চুলগুলো এলোমেলো উড়ছে
অতি যতেœ গাঁথা হয়নি হলুদ ডেফোডিল।

দূরের গুহায়

একদা -
লাল কার্পেটের জমিনে এলোমেলো
বেগুণী মেলায় অতিথি হলো এক জামদানী
পাখি। তাকে ঘিরে চৌদিকে মিষ্টি কলরব,
ধ্যান ও তীব্র দৃষ্টি।
মোহনীয়তার রঙীন নেশায় উষ্ণতার হলুদ
নদীতে ডুবে গেলো কিছু জলরাঙা সময়!

থোকা থোকা বাহারী শব্দের ঝড় উঠলো নীল
আকাশের ঈশান কোণে। কাঁচা বৃষ্টির শীতল
ওম স্পর্শের আগেই সময় বেঁধে দিল শিকল।
তাকেও চলে যেতে হল দূরের গুহায়।

ধূসর ক্যানভাস

ধূসর ক্যানভাসে সোনালী ঝর্ণার
ছবি একেঁ কি লাভ বলো?
এটা তো নতুন ঘরের শাদা দেয়ালে
অথবা কোনো ফটো এক্সিভিশনে মাথা
উঁচু করে দাঁড়াবে না।
তবে কেন কচ্ছপের খোলস গায়ে বসে থাকা?
তারচেয়ে ঢের ভালো মেহেদীর জলে
নরম হাতের তালুতে মখমল স্বপ্ন আকাঁ।

বৃষ্টির চাঁদর

আকাশের পাঁজর ছিড়ে বৃষ্টি ঝরছে
অবিরাম, অভিরত। পুরোটা শহর
মোড়ানো পানির চাঁদর। ঠিক সেই
অষ্টআশির রাক্ষুসী বন্যার মতো।

স্মৃতির ঘরে শাদা কাঁচের ফ্রেমে বন্দি
সেলিমা বেগমের বুক ফাঁটা আর্তনাদ,
বাতাসের বেণীতে নীল বেদনার জখম
অজানা আশংঙ্কায় বৃদ্ধার ভীত মলিন চোখ।

আরো মনে পড়ে -
ভাইটি প্রচন্ড জ্বরে বেহুশ, ডাক্তার নেই
নিকষ কালো রাত, দূর থেকে ভেসে
আসা কুনো ব্যাঙের গ্যাঙ গ্যাঙ ডাক।
প্রভুর দরবারে ছেলের আরোগ্য কামনায়
কান্নারত চোখে মায়ের সেই মোনাজাত
খোদারে আমায় নিঃস্ব করে বুকের মানিকরে বাঁচাও।